সব
সুনামগঞ্জে ফসল রক্ষা বাঁধ ভেঙে একের পর এক হাওরের ফসল পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে। এই ঘটনায় বাঁধ নির্মাণে প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির (পিআইসি) বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। এসব পিআইসি গঠন, নিয়ন্ত্রণ ও বাঁধের কাজে পেছন থেকে প্রভাব বিস্তার করেন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের বিভিন্ন ইউনিটের লোকজন। দলের নেতারা পিআইসি বিক্রি করেন—এমন অভিযোগও উঠেছে। নেতাদের সঙ্গে যোগসাজশ থাকে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের।
সুনামগঞ্জের হাওরে একসময় ঠিকাদারদের মাধ্যমে ফসল রক্ষা বাঁধের কাজ হতো। ২০১৭ সালে হাওরে ফসলহানির পর বাঁধ নির্মাণে ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। পরে বাঁধ নির্মাণে নতুন নীতিমালা করে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। এই নীতিমালায় বাঁধ নির্মাণে ঠিকাদারি প্রথা বাতিল করে প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি বা পিআইসির মাধ্যমে হাওরে ফসল রক্ষা বাঁধের কাজ হচ্ছে।
হাওরে বাঁধের কাজের নীতিমালা অনুযায়ী, স্থানীয় কৃষক ও সুবিধাভোগীদের নিয়ে পাঁচ থেকে সাত সদস্যের এসব পিআইসি গঠন করা হয়। একটি পিআইসি সর্বোচ্চ ২৫ লাখ টাকার কাজ করতে পারে। এবার সুনামগঞ্জে ৭২৭টি প্রকল্পে, অর্থাৎ ৭২৭টি পিআইসির অধীনে ১২২ কোটি টাকার কাজ হয়েছে।
সর্বশেষ সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার চাপতির হাওরে ফসলডুবির প্রতিবাদে গত রোববার সংবাদ সম্মেলন করেন স্থানীয় কৃষকেরা। তারা অভিযোগ করেন, বাঁধের কাজের অনিয়মের কারণেই এলাকার ৩টি ইউনিয়নের ৪৬টি গ্রামের মানুষের ফসল তলিয়ে গেছে। দিরাইয়ে বাঁধ ‘সিন্ডিকেটের’ নেতৃত্বে আছেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক প্রদীপ রায়। বিভিন্ন ব্যক্তির নামে পিআইসি থাকলেও এসব তিনিই নিয়ন্ত্রণ করেন। প্রদীপ রায় অবশ্য এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
প্রদীপ রায় বলেন, ‘বাঁধের কাজের পিআইসি গঠন বা কাজ করার মূল দায়িত্বে থাকেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও পাউবোর কর্মকর্তারা। আমরা যেহেতু রাজনীতি করি, তাই কারও জন্য সুপারিশ করতে পারি। আমরা বললেই কাউকে কাজ দিতে হবে কেন? কাজ তো দেওয়া হবে নীতিমালা মেনে।’
শুধু দিরাইয়ে নয়, এর আগে গত বৃহস্পতিবার দুপুরে পানিসম্পদ উপমন্ত্রী এ কে এম এনামুল হক শামীমের কাছে ধর্মপাশার নেতারা পিআইসি ‘বেচেন’ বলে অভিযোগ করেন এক কৃষক। উপজেলার ডুবে যাওয়া চন্দ্র সোনার তাল হাওর পরিদর্শনে গিয়েছিলেন উপমন্ত্রী। ওই কৃষক বলেন, ‘যত পিআইসি আছে, সবার কাছ থিকা এক লাখ টাকা করে নিয়া কাজ দিছে। নেতারাই এই টাকা নিছে। রোকন, বিলকিছ, আলমগীর, রাসেল—সব নেতারাই কাজ বেচে। যে টাকা বেশি দেয়, তারেই কাজ দেয়।’
ওই কৃষকের বক্তব্যের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কৃষক যে রোকনের নাম উল্লেখ করেছেন, তিনি স্থানীয় সাংসদ মোয়াজ্জেম হোসেনের ছোট ভাই, ধর্মপাশা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও উপজেলা যুবলীগের সভাপতি মোজাম্মেল হোসেন ওরফে রোকন। একটি পিআইসির বিপরীতে রোকন তার এক প্রতিনিধির মাধ্যমে তিন লাখ টাকা নিয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন উপজেলার জয়শ্রী ইউনিয়নের বাদে হরিপুর গ্রামের বাসিন্দা উজ্জ্বল মিয়া। ৫ এপ্রিল তিনি (উজ্জ্বল মিয়া) কাজের বিল হিসেবে ৩ লাখ ৬ হাজার ৭০০ টাকা ব্যাংক থেকে তোলার পর ব্যাংক থেকেই ওই টাকা নিয়ে গেছেন রোকনের প্রতিনিধি মুখলেছুর রহমান তালুকদার। এ বিষয়ে তিনি গত শনিবার ধর্মপাশা থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।
উপমন্ত্রীর কাছে অভিযোগ করা কৃষকের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি আমার মনের দুঃখ কইছি। এইতা তো সবাই জানে, কেউ কয় না আরকি। আমি কইছি, বাঁধের কাজের ভালা তালাবি (সঠিক কাজ) অইছে না। আমি কইছি, এখন প্রমাণ দরকার হইলে মন্ত্রী সাব বের করব।’
অভিযোগ প্রসঙ্গে মোজাম্মেল হোসেন ওরফে রোকন বলেন, ‘আমি বাঁধ নির্মাণের কাজে সম্পৃক্ত নই। এসব অভিযোগের কোনোটাই সত্য নয়। যে লোক মন্ত্রীর সামনে এসব বলেছে, সে বিএনপি থেকে মাত্র তিন মাস আগে আওয়ামী লীগে এসেছে। অনেকেই বলছেন, তার মাথায় সমস্যা আছে। আমি নিজেও সেখানে ছিলাম।’
ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে পিআইসির পেছনে থেকে সেগুলো নিয়ন্ত্রণ করার কমবেশি অভিযোগ আছে সব উপজেলাতেই। এবার বাঁধের কাজের শুরুতেই গত ১০ জানুয়ারি জেলা প্রশাসকের কাছে পিআইসি গঠনে অনিয়মের লিখিত অভিযোগ দেন শাল্লা উপজেলার তৎকালীন সব ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যানরা। পরে তৎকালীন ইউএনওকে বদলি করা হয়। কিন্তু একইভাবে অভিযুক্ত পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) উপজেলার দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা এখনো বহাল তবিয়তে আছেন। এরপর শাল্লায় আরও অন্তত ১০টি অভিযোগ হয়েছে পিআইসি গঠনে অনিয়ম নিয়ে।
শাল্লা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আল আমিন চৌধুরী বলেন, ‘বাঁধ নির্মাণে আমাদের কোনো দায়িত্ব নেই। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জিজ্ঞেসও করেন না। তবে বিপদে পড়লে সবার আগে আমরাই মাঠে নামি।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের দলের কৃষকদের জন্য সুপারিশ করতে পারি। কিন্তু যাকে দিয়ে কাজ আদায় করা যাবে, যার যোগ্যতা আছে, তাকেই তো সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাজ দেওয়ার কথা।’
জেলার দোয়ারাবাজার উপজেলার সুরমা ইউনিয়নের ১৯টি পিআইসির মধ্যে ১১টিই পেয়েছেন স্থানীয় গিরিশনগর গ্রামের বাসিন্দা এখলাছুর রহমান ফরাজি ও তার ভাই, ভাতিজা, ভাগনে, ভগ্নিপতিসহ আত্মীয়স্বজন। প্রায় চার কোটি টাকার কাজ এখানে। উপজেলা আওয়ামী লীগের কোনো পদে না থাকলেও তিনি দলের নেতাদের খুবই ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত। এখলাছুর রহমান অবশ্য বলেছেন, নীতিমালা অনুযায়ী তিনি ও অন্যরা এসব পিআইসি পেয়েছেন। কোনো অনিয়ম হয়নি।
পাউবো সূত্রে জানা গেছে, সুনামগঞ্জে ২০১৮ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত ৪ বছরে হাওরে ফসল রক্ষা বাঁধের ৪৪৩ কোটি টাকার কাজ হয়েছে। এর মধ্যে সর্বোচ্চ বরাদ্দ ছিল ২০১৮ সালে ৯৬৫টি প্রকল্পে ১৫১ কোটি টাকা। ২০১৯ সালে ৫২৭টি প্রকল্পে ৮০ কোটি টাকা, ২০২০ সালে ৭৪৪টি প্রকল্পে ১০২ কোটি, ২০২১ সালে ৮১০টি প্রকল্পে ১০৯ কোটি টাকা।
‘হাওর বাঁচাও আন্দোলন’ সংগঠনের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক বিজন সেন রায় বলেছেন, ‘আমরা আন্দোলন করেই এই পিআইসি পদ্ধতি এনেছিলাম। এখন এটিকে ঘিরে সবখানে একটা সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। স্থানীয়ভাবে রাজনৈতিক, অরাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তিরা এসব নিজেদের কবজায় নিয়ে লুটপাট করছেন। তাদের কারণেই কাজে অনিয়ম-দুর্নীতি হচ্ছে।’
এ প্রসঙ্গে সুনামগঞ্জ পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জহুরুল ইসলাম বলেন, প্রকল্প নির্ধারণ ও পিআইসি গঠনের কাজটি করে থাকে উপজেলা কমিটি। এ বিষয়ে কোনো অভিযোগ পেলে জেলা কমিটি ব্যবস্থা নেয়। তবে অনেকেই পিআইসিতে ঢুকতে না পেরে এসব অভিযোগ করেন। আবার স্থানীয়ভাবে বিরোধের কারণেও কেউ কেউ অভিযোগ করে থাকেন।
পোর্টাল বাস্তবায়নে : বিডি আইটি ফ্যাক্টরি