বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
ইতিকাফের সংঙ্গা: ইতিকাফের আভিধানিক অর্থ হলাে- কোন জিনিষকে আকড়ে ধরা এবং এর উপর নিজ সত্তা ও আত্মাকে আটকিয়ে রাখা। তবে শরিয়তের পরিভাষায় ইতিকাফ এর অর্থ হচ্ছে- ইবাদতের নিয়তে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য পুরুষদের মসজিদে অবস্থান করা এবং মহিলাদের নিজের ঘরে নির্দিষ্ট রুমে অবস্থান করা। ইতিকাফের উদ্দেশ্য হচ্ছে নিজেকে নিয়ে চিন্তা করা। মানুষ তার ব্যস্ততম জীবনে খুব কমই দ্বীনের কাজে সময় দিতে পারে। সেজন্যে ইতিকাফে বসে নিজের পরকাল নিয়ে চিন্তা করা, আত্মশুদ্ধির পরিকল্পনা ও ক্ষমা অর্জনের প্রচেষ্টার মাধ্যমে স্রষ্টার সাথে সম্পর্ক স্থাপন করা। রমদানের শেষ ১০ রাত্রে শবে কদরের রাত্রিতে এবাদতে মশগুল থাকার জন্যই ইতিকাফের বিধান চালু হয়েছে। রমজানের শেষ ১০ দিন ইতিকাফ করতে চাইলে ২০ রমদান সুর্যাস্তের পুর্বে মসজিদে প্রবেশ করতে হয়।
ইতিকাফের গুরুত্ব ও মহত্ব:
১. হযরত আয়েশা (রা.) বলেন- নবী করিম (সা:) জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত রমদানের শেষ ১০ দিন ইতিকাফ করেছেন, এরপর তার স্ত্রীরা ইতিকাফ করতেন। (বুখারী)
২. অন্য হাদিসে রাসুল (সাঃ) এরশাদ করেন- তােমরা রমদানের শেষ ১০ দশকে কদরের রাত্রি তালাশ করাে। (বুখারী, মুসলিম)।
৩. ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত- ইতিকাফকারী সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সা:) বলেছেন- ইতিকাফকারী গুনাহ থেকে বিরত থাকে। তাকে সকল নেক কাজের কর্মী বিবেচনা করে বহু ছওয়াব দেয়া হয়। (ইবনে মাজাহ)।
৪. রমদানের ১০ দিন ইতিকাফে থাকলে লাইলাতুল কদরের ফযীলত পাওয়ার আশা থাকে, যে রাতে এবাদত করলে হাজার মাসের ইবাদতের চেয়েও বেশী ছওয়াব পাওয়ার কথা পবিত্র কোরআনে আল্লাহ উল্লেখ করেছেন।
৫. খাটি ঈমান ও সহীহ নিয়তে যে ব্যক্তি ছাওয়াবের উদ্দেশ্যে ইতিকাফ করবে তার পূর্ববর্তি সমস্ত সগিরা গােনাহ মাফ করে দেওয়া হবে। (দায়লমী) তবে কবিরাহ গুনাহ তওবাহ ছাড়া মাফ হয় না, কাজেই কবিরাহ গুনাহগুলাের জন্য অনুতপ্ত হয়ে কায়মনােবাক্যে আল্লাহর দরবারে প্রতিদিন শেষরাত্রে তাহাজ্জুদের পর তওবা করার এক বিরাট সুযােগ পাওয়া যায়। এই সুযােগ কাজে লাগিয়ে যদি কেহ খাটি নিয়তে তওবা করেন এবং সেই গুনাহ গুলাে যদি বাকী জীবনে আর না করেন তবে আশা করা যায় আল্লাহ তায়ালা কবিরাহ গুনাহ গুলােও মাফ করে দিবেন।
ইতিকাফ চার প্রকার:
১.সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ ইতিকাফঃ
পাচ ওয়াক্ত নামায জামাতে আদায় হয় এমন কোন মসজিদে পুরুষদের রমদান মাসের শেষ ১০ দিন অবস্থান করা এবং মহিলারা নিজ ঘরে নির্দিষ্ট রুমে অবস্থান করা। অবশ্য ফিকাহবিদদের মতে জানাজার নামাযের বিধানের মতাে এটা সুন্নাতে মুয়াক্কাদায়ে কিফায়া, অর্থাৎ মসজিদের মুসল্লীদের মধ্য হতে কেহ পালন করলে অত্র এলাকার সব লােকেরা গুনাহ থেকে বেচে যাবেন কিন্তু কেউই আদায় না করলে অত্র এলাকার সব লােকেরা গুনাহগার হবেন। এই ইতিকাফ ভঙ্গ করলে তাহা পুনরায় আদায় করা (কাজা করা) ওয়াজিব।
২. নফল ইতিকাফ
কোন লােক যদি বিশেষ অসুবিধার কারনে রমদানের ২০ তারিখ থেকে শেষ রমদান পর্যন্ত (১০দিন বা ৯দিন) ইতিকাফে বসতে না পারেন, তবে ঐদিনগুলাের মধ্যে উনার সুবিধা মত সময়ে নফল ইতিকাফ এর নিয়ত করে মসজিদে অবস্থান করতে পারবেন। নফল ইতিকাফে উনি প্রয়ােজন মত বাহির হয়ে উনার কাজ কর্ম শেষ করে আবার মসজিদে এসে অবস্থান করতে পারবেন। ১, ২, ৩ অথবা পুরাে ১০ দিনই এরকম নফল এবাদত করা যায়। যারা সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ ইতিকাফ করতে পারবেন না তাদের জন্য এটাই সুবিধা যে রাত্রিবেলা সারারাত মসজিদে ইতিকাফের অবস্থায় এবাদতে মসগুল থেকে লাইলাতুল কদর এর পূর্ণ ফজিলত লাভ করার বিরাট সুযােগ পাওয়া যায়। নফল ইতিকাফের সর্বনিম্ন সময় এক ঘন্টা সুতরাং তাহা রােযা ব্যতিত অন্য সময়েও করা যায়। নফল বা মুস্তাহাব ইতেকাফকারী সূর্য পুরােপুরি অস্ত যাওয়ার পুর্বে মসজিদে প্রবেশ করবেন এবং ফজরের নামায পড়ে ভাের হওয়ার পর বের হবেন।
৩. ওয়াজিব ইতিকাফ:
কেউ যদি কোন কারনে ইতিকাফ করার মান্নত করেন অর্থাৎ ইতিকাফ এর ইচ্ছা পােষন করেন, তাহলে সেই ইতিকাফ আদায় করা ওয়াজিব। মান্নত ইতিকাফের জন্য রােযা রাখা জরুরী। মান্নত ইতিকাফের বেলায় কেউ যদি শুধু দিনের বেলা ইতিকাফ করতে চায় তবে শুধু দিনে করলেই চলবে, তবে মান্নতের সময় যদি রাতের কথাও উল্লেখ থাকে তবে রাতেও করতে হবে। কিন্তু শুধু রাতে ইতিকাফের মান্নত করলে তাহা ঠিক হবে না। মান্নত ইতিকাফের নিয়ত করার পর পালন না করলে গুনাগার হবেন। ওয়াজিব ইতিকাফ ভঙ্গ করলে তাহা আবার পুনরায় করা (কাজা করা) ওয়াজিব।
৪. মুস্তাহাব ইতিকাফঃ
মাহে রমদান মাসের শেষ ১০ দিন ছাড়া যে কোন সময় ইতিকাফ করা মুস্তাহাব। আমরা যখন মসজিদে নামায পড়ার জন্য যাই তখনও ইতিকাফের নিয়ত করলে যতক্ষণ আমরা মসজিদে অবস্থান করবাে ইনশাআল্লাহ আমরা ইতিকাফের ছাওয়াব পাব।
ইতিকাফের শর্ত এবং বিধান সমূহ:
১. মুসলমান হওয়া, জ্ঞান সম্পন্ন হওয়া, পাগল না হওয়া, মহিলাদের জন্য হায়েজ নেফাজ থেকে পবিত্র হওয়া।
২. নিয়ত করা কারণ কোন এবাদত নিয়ত ছাড়া সঠিক হয় না।
৩. পুরুষদের জন্য ইতিকাফের স্থান হতে হবে মসজিদ, যেখানে ৫ ওয়াক্ত নামায | জামাতে আদায় হয়। মহিলারা ঘরে ইতিকাফ করতে পারবেন।
৪. সুন্নতে মুয়াক্কাদাহ ইতিকাফের জন্য রমজানের ২০ তারিখ মাগরিবের সময় হওয়ার আগেই বিছানা পত্র নিয়ে মসজিদে উপস্থিত হওয়া।
৫. ওয়াজিব ইতিকাফের জন্য রােযা শর্ত।
৬. নফল ইতিকাফের জন্য রােযা শর্ত নয়।
৭. ইতিকাফ চলাকালিন সময় গােসল ফরজ হলে সাথে সাথে গােসল করা উচিৎ।
৮. ইতিকাফের জন্য মসজিদে প্রবেশ করার সাথে সাথে মসজিদের সীমানা জেনে নেওয়া উচিৎ কারণ শরিয়তী প্রয়ােজন ছাড়া মসজিদের সীমানার বাহিরে যাওয়া হারাম। শরিয়তী প্রয়ােজন যেমন- পাঞ্জেগানা মসজিদে ইতিকাফ করলে জুমুয়ার নামাযের জন্য জামে মসজিদে যাওয়া যাবে। ফরজ নামাযের জন্য অযুর দরকার হলে যাওয়া যাবে কিন্তু নফল এবাদত যেমন কোরআর মজিদ পাঠ করা বা নফল নামায পড়ার জন্য অযু করতে যাওয়া যাবে না। এমনকি ফরজ নামাযের জন্য অযু আছে এমতাবস্থায় ফ্রেস অযু করার জন্যও সীমানার বাহিরে যাওয়া যাবে না। কাজেই নফল এবাদতের জন্য অজু করার একমাত্র সুযােগ হলাে যখন প্রশ্রাব বা পায়খানার প্রয়ােজনে বাহিরে গেলে তখন অযু করে আসা, বা ঐ সময় গােসল করার ইচ্ছা থাকলে খুব অল্প সময়ে গােসলও করা যাবে। তবে ফরজ গােসল হলে সাথে সাথে শুধু ফরজ গােসলের জন্য যাওয়া যাবে। তাছাড়া মসজিদের ভিতর খাবার খাওয়ার কোন সুযােগ একেবারে না থাকলে খাবারের জন্য মসজিদের বাহিরে গিয়ে যত অল্প সময়ে সম্ভব বেদরকারী কথাবার্তা না বলে মসজিদে চলে আসা। জরুরী প্রয়ােজন ছাড়া অল্প সময়ের জন্যও মসজিদের নির্ধারিত স্থান থেকে বাহির হলে ইতিকাফ ভেঙ্গে যাবে।
৯, স্বপ্নদোষ হলে ইতিকাফ নষ্ট হবে না তবে সাথে সাথে গােসল করতে হবে।
১০. ইতিকাফকারীর বেলায় জরুরী কথাবার্তা বলা, বিয়ে শাদীর আকদ করাননা, সুগন্ধি আতর, তৈল ইত্যাদি ব্যবহার করা এবং ঘুমাতে কোন বাধা নাই।
১১. ইতিকাফ করার স্থান হিসেবে সর্বত্তোম স্থান হলাে মসজিদুল হারাম, তারপর যথাক্রমে মসজিদে নববী, মসজিদুল আকসা, জামে মসজিদ যেখানে জুমুয়ার নামায হয় অত:পর এলাকার মসজিদ যেখানে জুমুয়ার নামায ছাড়া শুধু ওয়াক্ত নামায হয়। ১২. হঠাৎ বমি এসে গেলে মসজিদ অপবিত্র না করার উদ্দেশ্যে মসজিদের বাহিরে যাওয়া যাবে, যাতে মসজিদের বাহিরে বমি করা যায়। কি কি কারনে ইতিকাফ বাতিল হয়: নিম্নোক্ত কাজগুলাের যে কোন একটি সংগঠিত হলে এতেকাফ বাতিল হয়।
১. বিনা প্রয়ােজনে ইচ্ছাকৃতভাবে মসজিদের বাহিরে গেলে, তা যত অল্প সময়ের জন্যই হােক না কেনাে। কেননা এ কারনে তিনির মসজিদে অবস্থান হচ্ছে না, যা ইতিকাফ বিশুদ্ধ হওয়ার অবিচ্ছেদ্য অংশ।
২. পাগল হওয়ার কারনে বুদ্ধি হারালে।
৩. মাতাল হওয়ার কারনে বুদ্ধি হারালে।
৪. মাসিক ও প্রসবােত্তর ঋতু স্রাব হলে।
৫. মুরতাদ হওয়া- কেননা ইতিকাফ বিশুদ্ধ হওয়ার জন্য মুসলমান হওয়া শর্ত।
৬. সহবাস: কেননা আল্লাহ তায়ালা বলেছেন- তােমরা মসজিদে এতেকাফ অবস্থায় স্ত্রীদের সাথে মিলিত হবে না। এ হচ্ছে আল্লাহর নির্ধারিত সীমা। কাজেই এ কাজের নিকটবর্তী হবে না। (সুরা আল বাকারা- ৮৭)
৭. পেশাব পায়খানার জন্য বের হলে প্রয়ােজন শেষ হওয়ার সাথে সাথে চলে আসা, ইমাম আবু হানীফা (রহঃ) এর মতানুসারে অযথা প্রয়ােজনের অতিরিক্ত সময় অবস্থান করলে ইতেকাফ ভঙ্গ হবে।
৮. ইতেকাফ অবস্থায় দুনিয়াদারীর বিষয় নিয়ে খুব বেশী আলােচনায় ব্যস্ত থাকলে অথবা কোন বড় ধরনের ক্রয়-বিক্রয় নিয়ে অধিক সংখ্যক লােকজন নিয়ে দির্ঘ্য আলােচনায় ব্যস্ত থাকলে ইতেকাফের বড় ধরনের ক্ষতি হবে। কোন কোন ক্ষেত্রে ইতেকাফ নষ্ট হয়ে যাবে।
৯. ইতেকাফকারী রােগী দেখার জন্য বা জানাজার নামাযে শরীক হওয়ার জন্য মসজিদ থেকে বাহিরে যেতে পারবেন না।
কখন ইতিকাফের জন্য মসজিদে প্রবেশ করবেন :
নফল ইতিকাফের যেহেতু কোন সময় নির্ধারিত নেই, তাই নফল ইতিকাফকারী যখনই মসজিদে প্রবেশ করে ইতিকাফের নিয়ত করবেন তখনই উনার জন্য ইতিকাফ শুরু হয়ে যায়। কিন্তু রমদানের শেষ দশদিন (সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ) ইতিকাফ করতে চাইলে রমদানের ২০ তারিখ সূর্য অস্ত যাওয়ার পূর্বে অর্থাৎ মাগরিবের নামাযের ওয়াক্ত শুরু হওয়ার আগেই মসজিদে প্রবেশ করতে হবে। তবে যদি ওয়াজিব ইতিকাফ অর্থাৎ মান্নতের ইতিকাফ হয়, তাহলে যত দিনের মান্নত করবেন এর প্রথম দিনে সুবহে সাদিকের পূর্বে মসজিদে প্রবেশ করতে হবে। কেননা সুবহে সাদিকের পর থেকে দিন আরম্ভ হয়ে যায়। যদি কয়েক দিনের মান্নত করেন তাহলে পরবর্তি রাতগুলােও ইতিকাফের মধ্যে শামিল হবে। (ফাতহুল কাদীর)
ইতিকাফ শেষ করে কখন মসজিদ থেকে বের হবেন :
ইমাম আবু হানিফা ও শাফেয়ী (রহ.) এর মতে যে ব্যক্তি রমদানের শেষ ১০ দিন ইতেকাফ করবেন তিনি রমদানের শেষ দিনের সূর্য অস্ত যাওয়ার পর মসজিদ থেকে বেরুবেন। তবে ইমাম মালেক ও আহমদ (রহ.) এর মতে ঈদের নামাযের পূর্ব পর্যন্ত মসজিদে অবস্থান করা মুস্তাহাব।
ইতিকাফ কারীর জন্য করণীয়:
১. খাটি নিয়তে একমাত্র আল্লাহতায়ালার সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যমে জীবনে গুনাহখাতা মাফ করার উদ্দেশ্য নিয়েই ইতিকাফে অবস্থান করা।
২. ইতিকাফের পরিপন্থি কোন কাজ যাতে না হয় তারজন্য বিশেষ খেয়াল রাখা। ছাওয়াবের উদ্দেশ্যে এসে কোন ভাবেই যেন কোন গুনাহের কাজ না হয় এ ব্যাপারে সতর্ক থাকা।
৩. নফল নামায, কোরআন তেলাওয়াত, হাদীস, তাফসীর, আল্লাহর জিকির ও অন্যান্য ইসলামী বই পুস্তক পড়া এবং মসজিদে যদি দরসে হাদীস, দরসে কোরআন এর ব্যবস্থা করা হয় তাহলে ঐগুলােতে উপস্থিত থেকে এই অতি মূল্যবান সময় অতিবাহিত করা। নফল নামায গুলাের মধ্যে যেমন তাহাজ্জুদ, ইশরাক, চাশত বা সালাতুদ দুহা, যাওয়াল, মাগরেব ও এশার মধ্যেকার নফল নামায (আওয়াবীনের নামাজ), সালাতুত তাসবীহ নামায পড়া যায়।
৪. কে কতবার কোরআন খতম করতে পারেন সেই প্রতিযােগীতায় না গিয়ে বরং ধীরে ছিরে অর্থসহ বুঝে পড়া এবং তা আমল করা অনেক বেশী ছওয়াবের কাজ। পবিত্র কোরআনের ১টি অক্ষর না বুঝে পড়লেও দশটা নেকী পাওয়া যায় তাতে কোন সন্দেহ নাই কিন্তু আল্লাহতায়ালা কোরআন নাজিল করার মূল উদ্দেশ্য হলাে মানুষেরা যেন তা বুঝেন এবং আমল করেন। কাজেই কোরআনের একটি আয়াত যদি ভাল করে বুঝে আমল করা যায় বা নিজের জীবনে তা বাস্তবায়ন করা যায় তবে তা না বুঝে হাজার বার কোরআন খতম করার চেয়ে উত্তম ও অনেক বেশী সওয়াবের কাজ।
৫. কোন ব্যক্তি যখন তার নিজ পরিবার পরিজন, ব্যবসা বানিজ্য বা অফিস আদালত ছেড়ে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য আল্লাহর ঘর মসজিদে এসে। হাজির হয়ে যান তখন সেই ব্যক্তির উপর আল্লাহর রহমত বেশী ভাবে নিপতিত হয়। কাজেই ইতিকাফ অবস্থায় জীবনের ছােট বড় গুনাহ গুলাে স্বরণ করে করে কায়মননা বাক্যে আল্লাহর দরবারে তওবা করা এবং বাকী জীবনে এইসব গুনাহ আর না করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে কান্নাকাটি করা, তখন আল্লাহ রাব্বল আলামিন জীবনের সমস্থ গুনাহ গুলাে মাফ করে দিবেন বলে আশা পােষণ করা যায়।
ইতিকাফ অবস্থায় মসজিদে বসে থাকা বা প্রয়ােজন অনুযায়ী ঘুমিয়ে থাকার সময়টাকেও এবাদত হিসেবে গন্য করা হয়, তবে অবসর সময় একেবারে মুখ বন্ধ করে বসে না থেকে মনে মনে সব সময় আল্লাহর জিকিরে জিব্বাকে ব্যস্ত রাখা ভাল। আল্লাহর সন্তুষ্টি ও নৈকট্য লাভের পথে যেন কোন দুনিয়াবী চিন্তা ও কাজ বাধা সৃষ্টি করতে না পারে। ইতিকাফ কিছুতেই বৈরাগ্যবাদ নয়, বৈরাগ্যবাদ হলাে স্থায়ী জিনিষ আর ইতিকাফ সাময়িক সময়ের জন্য।
৭. জামাতে নামায আদায়ের জন্য আগে থেকেই প্রস্তুত থাকা জরুরী যাতে করে তাকবিরে উলার সাথে সাথে নামাযে শরিক হওয়া যায়, তাকবিরে উলা হলাে ইমাম সাহেব আল্লাহু আকবার বলে নামায শুরু করার সাথে সা আল্লাহু আকবার বলে নামাযে শরিক হওয়া।
৮. যে সব বিশেষ সময়গুলােতে দোয়া কবুল হয় ঐসব সময়গুলােতে যতবেশী সম্ভব দোয়া করা, যেমন- আযান ও একামতের মধ্যেকার সময়, ফরজ নামাজের পর, ইফতারের সময়, জুমুয়ার দিন ইমাম সাহেব খুতবার প্রথম অংশের পর যখন বসেন তখন, জুমুয়ার দিন আছর থেকে মাগরিবের সময়ের মধ্যেও দোয়া কবুল হয়, তাছাড়াও শেষ রাত্রে তাহাজ্জুদের নামাযের শেষে এবং নফল নামাযে সেজদারত অবস্থায় দোয়া কবুল হওয়ার সম্ভাবনা সর্বাধিক।
৯, মসজিদে অবস্থান কালে সব সময় পরিষ্কার কাপড় পরিধান করা, আতর ব্যবহার করা, প্রয়ােজনে তৈল ও ক্রীম ব্যবহার করতে কোন অসুবিধা নেই। অযু করার সময় মিসওয়াক ব্যবহার করা, কারণ মিসওয়াকের সহিত অযু করে নামায পড়লে নামাযের সওয়াব ২০ গুন বাড়িয়ে দেওয়া হয়। অযুর সময় যে ব্যক্তি সব সময় মিসওয়াক করেন- মৃত্যুর সময় কালিমা শাহাদাহ। তার নছিব হওয়ার সম্ভাবনা থাকে (রাহুম মুকতার ১ম খন্ড অযুর সুন্নাতের বাব)। মসজিদে অবস্থান কালে কোন অবস্থায় মসজিদ যাতে অপবিত্র না হয় সেদিকে খেয়াল রাখা, যদি কোন কারনে মসজিদের মুসাল্লা না পাক হয়ে যায় তবে সাথে সাথে আলাপ করে তাহা পবিত্র করার ব্যবস্থা করা।
১০. অবসরের ফাকে যখন চা বিস্কুট নিয়ে কয়েকজন একত্রে বসেন তখন খেয়াল রাখা দরকার উচ্চ স্বরে কথা না বলা, কারণ রমযানে মসজিদে সব সময় মুসল্লিরা কোরআন তেলাওয়াত, জিকির আজকার বা নফল নামাযে ব্যস্ত থাকেন। তাছাড়া ঐসময় দুনিয়াবী কোন কথাবার্তা না বলে বরং নিম্ন স্বরে কোরআন হাদিস নিয়ে আলােচনা করা। ইতিকাফে বসে পরনিন্দা ও গীবতের মত জগন্য কথাবার্তা বলতেও শুনা গিয়েছে যাহা ইতিকাফ অবস্থায় জগন্যতম একটি অপরাধ। ছাও্যাবের জন্য এসে আমরা যেন গুনাহের বােঝা নিয়ে না যাই এব্যাপারে বিশেষ খেয়াল রাখা এবং একে অন্যকে এব্যাপারে সতর্ক করা দরকার। মনে রাখা দরকার মসজিদে ইওতকাফের জন্য আসার সময় বিছানা পত্রের বােঝা এর সাথে আরাে একটি বােঝ নিজের অজান্তেই সাথে চলে এসেছে আর সেটা হলাে নিজেদের গুনাহের বােঝা। যাওয়ার সময় বিছানা পত্রের বােঝা ঠিকই সঙ্গে যাবে কিন্তু গুনাহের বােঝাটি যেন কোন অবস্থায় আবার সাথে না যায় এটাই যেন হয় আমাদের সবার আপ্রান চেষ্টা।
১১. দিন রাত একসাথে বেশ কয়েকজন লােক একত্রে থাকতে গেলে স্বাভাবিক ভাবেই একে অন্যের কিছু ভাল লাগা, না লাগার ব্যাপার থাকে। বিভিন্ন জনের কথাবার্তা, চাল-চলন, আচার ব্যবহার একটু ভিন্ন ধরনের হওয়াই স্বাভাবিক। কোন অবস্থাতেই যেন ধৰ্য্য হারা না হওয়া যায়। সব সময় একে অন্যের সুবিধা অসুবিধার কথা চিন্তা করে কাজ করা। কোন অবস্থাতেই অন্যের মনে যেন কোন কষ্ট দেওয়া না হয়, মানুষের মন ভাঙ্গা, কৃাবা ঘরকে ভেঙ্গে ফেলার চেয়েও বড় অপরাধ। প্রতিটি কাজে একে অন্যের খেয়াল রাখা এবং অন্যের মনে কষ্ট না দেওয়া এটাও একটি বড় ধরনের এবাদত ও ছাওয়াবের কাজ।
১২. ইতিকাফ অবস্থায় ফেইসবুক বা সােসিয়াল মিডিয়া ব্যবহারের ব্যাপারে খুব সতর্ক থাকা দরকার। সাধারণত ভাল কোন খবর খুজতে গিয়ে ফেইসবুক অপেন করা হয় কিন্তু ভাল এর সাথে অনেক খারাপ জিনিষও চলে আসবে। ইতিকাফে বসে যদি না যায়েজ কোন ছবি চোখের সামনে ভেসে উঠে তখন সােওয়াবের পরিবর্তে গুনাগার হওয়াটাই স্বাভাবিক। কাজেই ইতিকাফ অবস্থায় এইসব বন্ধ রাখাই উত্তম।
১৩, অনেক সময় দেখা যায় কোন কোন ইতিকাফকারীর ভিজিটারদের সংখ্যা অনেক বেশী থাকে, এতে করে নিজের যেমন এবাদতে বাধার সৃষ্টি হয় সাথে সাথে আশ পাশের লােকদেরও কষ্ট হয়। এইসব ব্যাপার গুলােও খেয়াল রাখা উচিত।
১৪. অনেকের আত্বীয় স্বজন আবার প্রয়ােজনের অতিরিক্ত অনেক খাবার একসাথে নিয়ে আসেন যে গুলাে খেতে গেলে বেশী খাওয়ার কারনে ইবাদতে কষ্ট হয়, ঘুমের ভাব আসে, আবার ডাষ্টবিনে ফেলে দিলেও অপচয়ের জন্য গুনাহের ভাগী হতে হয়। প্রয়ােজনে অতিরিক্ত খাবার পরিহার করা, যাতে করে শরীরে অলসতা না আসে।
১৫. অনেকে উচ্চস্বরে কোরআন তেলাওয়াত করেন, এতে অন্য তেলাওয়াতকারীর যেমন অসুবিধা হয় তেমনি যারা ঘুমিয়ে আছেন বা নফল এবাদতে ব্যস্ত আছেন তাদেরও অসুবিধা হয়।
১৬. ইতিকাফকারীরা মসজিদে দিনরাত থাকার কারনে মসজিদের গ্যাস, ইলেকট্রিক, পানি ইত্যাদি অনেক বেশী ব্যবহার করা হয়ে থাকে। এইসব অতিরিক্ত খরছ পরিশােধ করার জন্য প্রত্যেক ইতেকাফকারীর উচিৎ মসজিদে কিছু টাকা দান করা যাতে আল্লাহর ঘরের হক আদায় হয়।
১৭. সুন্নত ইতিকাফ শুরু করার পর তা কোন কারণে পুর্ণ করতে না পারলে পরবর্তীতে কাজা আদায় করা উত্তম। হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত এক হাদীসে জানা যায়, একবার রাসুলুল্লাহ (সা.) শাওয়াল মাসে তা কাযা আদায় করেছিলেন।
১৮. সুন্নতে মুয়াকেদাহ ইতিকাফ অবস্থায় কেউ যদি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং তাকে যদি হাসপাতালে বা ঘরে চলে যেতে হয় তবে উনার ইতিকাফ ভঙ্গ হয়ে যাবে। পরবর্তীতে সুবিধামত সময়ে সেই ইতিকাফ ক্বাযা করতে হবে।
১৯. খাবার বাসন পাত্র ধুয়া বা শুধু হাত ধুয়া, দাঁত ব্রাশ করা এবং নফল এবাদত
যেমন- কোরআন তেলাওয়াত, নফল নামায ইত্যাদি পড়ার জন্য অযু করার উদ্দেশ্যে মসজিদের সীমানার বাহিরে যাওয়া যাবে না। শুধু মাত্র পেশাব, পায়খানা ও ফরজ নামাযের জন্য অযুর দরকার হলে এবং ফরজ গােসলের কারন হলে যাওয়া যাবে। কাজেই পেশাব পায়খানার জন্য যখন বাহিরে যাবেন তখনই নফল এবাদতের জন্য অযু করে নিতে পারেন বা গােসল করার ইচ্ছা হলে অতি অল্প সময়ে গােসল ও করে নিতে পারবেন।
২০. বৎসরের ১২ মাসের যে কোন সময়েই যখন নামাযের জন্য মসজিদে প্রবেশ করবেন তখন ইতিকাফের নিয়ত করলে যতক্ষন মসজিদে অবস্থান করা হয়। ততক্ষন ইতিকাফের ছাওয়াব পাওয়া যায় তবে উক্ত সময়ে বেদরকারী কথাবার্তা না বলাই ভাল।